Blog

18 Jul 2013

Author: Md. Mahmud Hossain

সাভারে ভবন ধ্বস এবং ভবিষ্যৎ করণীয়

১. ভূমিকা:
সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়শই ভবন ধ্বসের ঘটনা ঘটছে। বস্তুতঃ যথাযথ পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা ছাড়া ভবনের নক্সা প্রণয়ন ও নির্মান তদারকি, নি¤œ মানের নির্মাণ সমগ্রীর ব্যবহার ও নির্মাণ ক্রটি, প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যাতিরেকে নীচুজমি ভরাট করে ভবন নির্মাণ, বিল্ডিং কোডসহ প্রচলিত ইমারত নির্মাণ আইন ও নগর পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে যত্রতত্র ইচ্ছামত ভবন নির্মাণের প্রবণতা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহের যথাযথ তদারকির অভাব ও সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বিশেষজ্ঞরা এ জাতীয় দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী বলে মনে করে থাকেন। সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনাকে একটি মানব সৃষ্ট দূর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই মানব সৃষ্ট দূর্যোগে আমাদের অসহায়ত্ব যেভাবে সামনে চলে এসেছে, আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি প্রাকৃতিক দূর্যোগে আমাদের অসহায়ত্ব হবে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী।

২. সাভারে রানা প্লাজা ধ্বস:
বিগত ২৪ এপ্রিল ২০১৩ বুধবার সকাল ৯.০০টার দিকে সাভার বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন ৮ তলা রানা প্লাজা ভবনটি ভেঙ্গে পড়ে। উক্ত ভবন ধ্বসের ঘটনায় দূর্ভাগ্যজনকভাবে মোট ১১২৭ জন মৃত্যু বরণ করেন যার অধিকাংশই ভবনের ৪র্থ থেকে ৮ম তলায় অবস্থিত ৪টি গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত শ্রমিক ও কর্র্মী। এ ঘটনায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ২৪৩৮ জনকে।

৩. ধ্বসের সম্ভাব্য কারণ:

ক. দালানের ভীত: জানা যায়, ভবনটির রাস্তা সংলগ্ন সম্মুখভাগ শক্ত মাটির উপরে ও পেছনের অংশ জলাবদ্ধ, নীচু ও নরম মাটির উপর নির্মিত ছিল। ফলে, প্রয়োজনীয় ভীত ও পাইলিং এর অভাবে ভবনটির পেছনের অংশ দেবে যেয়ে ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।

খ. ভবনের ডিজাইন ও তলা সংখ্যা : ভবনটি আট তলা ছিল। যার নবম তলার কাজ চলছিল বলে জানা যায়। ভবনটি প্রথমে ছয় তলা হিসেবে নির্মিত হলেও পরে ঐ ভিত্তির ওপর দশ তলা বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে সাভার পৌরসভার অনুমোদন লাভ করে। ছয় তলার ভিত্তির ওপরে দশ তলার নির্মাণই ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এর সাথে কাঠামোগত দুর্বলতা দুর্ঘটনাকে ত্বরান্বিত ও অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

গ. ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন: ছয় তলা ভবনটির কলাম সাইজ, রডের পরিমাণ ও বিন্যাস হতে প্রতীয়মান হয়, এটি সাধারণ ভবন হিসেবে তৈরী হয়েছে। ভবনটির নীচতলা বাণিজ্যিক ভবন এবং ওপরের তলাসমূহ গার্মেন্টস কারখানা হিসেবে পরিবর্তিত হয়েছে। গার্মেন্টস কারখানা সমূহের বিভিন্ন তলায় জেনারেটরসহ বিভিন্ন ভারী যন্ত্রাংশ বসানো ছিল যা চালু অবস্থায় সমগ্র ভবনে কম্পন সৃষ্টি করত। ভবনের দুর্বল ভীত ও কাঠামো দিনের পর দিন এ ধরনের ওজন (খরাব খড়ধফ) ও কম্পন সহ্য করার জন্য উপযুক্ত ছিলনা।

ঘ. নির্মাণ তদারকি : ভবনটির নির্মাণকালে পরামর্শক এবং কর্তৃপক্ষীয় স্থপতি ও প্রকৌশলী কর্তৃক তদারকির অভাব এবং একইসাথে উপযুক্ত কর্মকর্তার সক্ষমতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা প্রশ্নাতীত নয়। স্বভাবিকভাবেই ভবনটি নির্মাণে যে সকল মানদন্ড বজায় রাখা অত্যাবশ্যকীয় তা মানা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ভবনটিতে ফাটল দৃশ্যমান হবার পরও পূর্ণদ্যমে কার্যক্রম চালু রাখা এবং সে কারণে শ্রমঘণ কারখানা হওয়ায় বিপুল লোকের ভবনে অবস্থান দূর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

৪. ভবনের নক্শা অনুমোদন প্রক্রিয়াঃ

ক. ভুমি ব্যবহার ছাড়পত্র
১) রাজউক এলাকার মধ্যে যে কোন উন্নয়ন ডিএমডিপি-১৯৯৫-২০১৫ অনুযায়ী হবে।

২) ডিএমডিপি-র তৃতীয় ও শেষ ধাপ অর্থাৎ ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) এর ভূ’মি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ অনুসারে জোন অন্তÍর্গত প্লটের ভূ’মি নিশ্চিত হবে। ড্যাপ রিপোর্টে জোন অনুমোদিত ব্যবহার তালিকাবদ্ধ আছে। প্রস্তাবিত ভূ’মি ব্যবহার এই তালিকা বহির্ভূত হলে ছাড়পত্র পাবার অযোগ্য বিবেচিত হবে। এমনকি ছাড়পত্র কর্তৃপক্ষ স্বাক্ষরিত হলেও যদি জোন তালিকায় ঐব্যবহার না থাকে তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। সরকারীভাবে উন্নয়নকৃত প্লট ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে এই অনুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক। একই প্রক্রিয়ায় সারা বাংলাদেশের প্রত্যেক উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগীয় শহরে একই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ম প্রয়োগ আবশ্যকীয় হওয়া একান্ত প্রয়োজন। রানা প্লাজার ক্ষেত্রে ড্যাপ-এর ভূমি ব্যবহার জোনিং প্ল্যান অনুযায়ী প্লটটি আবাসিক জোন হিসেবে চিহ্নিত। একারণে ভবনটির বাণিজ্যিক হিসেবে অনুমোদনপ্রাপ্তি বৈধ নয়।

খ. ভবনের নক্শা অনুমোদনঃ

১) ভুমি ব্যবহার ছাড়পত্র পাবার পর ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-র সর্বশেষ সংস্করণ অনুযায়ী নক্সা করে কর্তৃপক্ষের নিকট অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হয়। এই নক্শা প্রণয়নের সময় অনেকগুলি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। যেমনঃ
- ভূমি জরিপ (পুরকৌশলী, ডিপোমা প্রকৌশলী বা সনদপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার)
- মাটি পরীক্ষা (জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা পুরকৌশলী বা মৃত্তিকা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান)
- স্থাপত্য ডিজাইন ও নক্শা (স্থপতি)
- ভীত ও কাঠামোগত ডিজাইন ও নক্শা (পুরকৌশলী বা ষ্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার)
- বৈদ্যুতিক ডিজাইন ও নক্শা (তড়িৎ প্রকৌশলী)
- প্লাম্বিং ও স্যানিটারী ডিজাইন নক্শা (প্লাম্বিং ইঞ্জিনিয়ার)
- যান্ত্রিক ডিজাইন ও নক্শা (যন্ত্র প্রকৌশলী) কিন্তু উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (যেমন রাজউক, পৌরসভা ইত্যাদি) শুধুমাত্র লেআউট অনুমোদন করে থাকে, যা কাংখিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেনা।

৫. ভবন নির্মাণ তদারকী ও অননুমোদিত নির্মাণ প্রতিরোধঃ
রাজউকসহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহ তাদের আওতাধীন এলাকার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেঅনুযায়ী উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু বাস্তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়ণ নিয়ন্ত্রণে তাদের সক্ষমতা কখনও পরিলক্ষিত হয়না। যেকোন ব্যর্থতায় ৫৯০ বর্গমাইল এলাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে রাজউক তাদের জনবল স্বল্পতার কথাটি বিশেষভাবে সামনে নিয়ে আসেন। বিষয়টি অসত্য নয়। কিন্তু তাদের মোট ১০৮১ জনবলের মধ্যে মাত্র ২৫৩ জন নগর পরিকল্পনার সাথে যুক্ত। অবশিষ্ট ৮২৮ জন সরাসরি উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত যার জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট সংস্থা রয়েছে। এই কাজের দ্বৈততা একদিকে যেমন সমন্ব^য় ব্যহত করে তেমনি নগরের পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তাদের নিদারুনভাবে ব্যর্থ করে। উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি পৌরসভা ও সিটিকর্পোরেশনসমূহে আরও ভয়াবহ। রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ার পরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভবনটি নির্মানে তাদের অনুমোদন/অনুমতি গ্রহণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে রাজউক এরূপ অবৈধ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বলে বক্তব্য দেয়। ভবন মালিক যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যাতিরেকে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে নির্মাণ কাজ চালিয়ে গেল এবং ভবন ধ্বসে পড়ার আগ পর্যন্ত রাজউক এ বিষয়ে কোন ভূমিকা গ্রহণ করল না, বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সকলের নিকট উত্থাপিত হচ্ছে। দেশে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী ও স্থপতি থাকার পরেও শুধুমাত্র জনবল সংকট এই যুক্তিতে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রাপ্ত একটি সরকারী সংস্থা তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না বলে আমরা মনে করি। হতাশার বিষয় হল একদিকে যখন উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রের অভাবে প্রতিবছর অসংখ্য নগর পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন তখন ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বৃহত্তর গুরুত্বপূর্ণ নগরসমূহের পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তÍবায়ন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পৃক্ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহের অকার্যকর ভূমিকা ও দায়িত্বহীনতায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে, অসংখ্য পরিবার হচ্ছে সর্বশান্ত।

৬. বি.আই.পি.-র প্রস্তাবণা:


ক. উদ্ধারকৃত মৃতদেহ সৎকার, আহতদের চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারসমূহের পুনঃর্বাসনে সরকারী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

খ. সাভার ভবন ধ্বস ঘটনায় ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র প্রদান (যদি দেয়া হয়ে থাকে), নক্শা অনুমোদন, স্থাপতিক ও কাঠামোগত নক্শা প্রণয়ন, নির্মাণ ও ব্যবহারের সাথে জড়িত দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার প্রয়োজনে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে।

গ. দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করে তা জাতির সামনে প্রকাশ করতে হবে।

ঘ. সাভারসহ ইতোপূর্বে সংঘঠিত সকল ভবন-দূর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচার বিভাগীয় ট্রাইবুনাল গঠন করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ঙ. সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে পেশাজীবী সংগঠনের সমন্বয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনসমূহ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত জরিপ কার্যক্রম সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

চ. রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহকে শুধুমাত্র পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত রাখতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ন্যায় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান নিজে কোনরূপ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরাসরি উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হতে পারবে না তা নিশ্চিত করতে হবে।

ছ. আগামীতে এরূপ দূর্ঘটনার সম্ভাব্যতা এড়াতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সকল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জনবল কাঠামো পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ উপযোগী করে প্রয়োজনীয় পেশাজীবীদের দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করে জনবল সংকট দূর করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরো দক্ষ ও কার্যকর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

জ. মাঠ পর্যায়ে পৌরসভাসমূহের মাধ্যমে পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিতকল্পে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। অবিলম্বে দেশের সকল পৌরসভায় স্বতন্ত্র নগর পরিকল্পনা বিভাগ সৃষ্টি করে দক্ষ ও যোগ্য পেশাজীবীদের নিয়োগের মাধ্যমে সারা দেশের পরিকল্পিত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে।

ঝ. বিদ্যমান বিধিসমূহের বিভিন্ন অসামঞ্জস্যতা চিহ্নিত করে তা দূর করা, প্রচলিত আইনসমূহ, যেমন- বিএনবিসি, ইমারত নির্মাণ আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

ঞ. পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অযাচিত এবং অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

ট. দূর্যোগ পরবর্তী ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটাতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। উদ্ধার কাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

ঠ. শিল্প কারখানা নির্ধারিত জোনে স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক এলাকা থেকে শিল্প কারখানা নির্ধারিত তড়হব-এ সরিয়ে নিতে হবে।

ড. ভূমি ব্যবহার জোন ও কর্তৃপক্ষ অননুমোদিত স্থাপনায় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ সকল সংযোগ প্রদান বন্ধ রাখতে হবে। সেইসাথে এইরূপ ভবনে কোন শিল্প কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য ইত্যাদিকে ব্যবসার অনুমতি, ব্যাংক লোন ইত্যাদি সুবিধা প্রদান বন্ধ রাখতে হবে।

ঢ. বিগত ২৯/০৪/২০১৩ তারিখ মন্ত্রিসভা বৈঠকে ”সরকার অধিভূক্ত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন এলাকায় সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ কোন ভবনের নক্সা অনুমোদন করতে পারবে না অর্থাৎ রাজউকসহ চারটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এলাকায় শুধু এই সংস্থাগুলোই ভবনের নক্সা অনুমোদন দেবে” এই সুপারিশের সাথে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহের বর্তমান পারফরমেন্সের বিবেচনায় বি.আই.পি একমত পোষন করতে ভরসা পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে ড্যাপ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত সিটিকর্পোরেশন ও পৌরসভাসমূহের পরিকল্পনাবিদগণ রাজউকের নিয়মানুযায়ী অনুমোদনের সুযোগ রাখার পক্ষপাতী। এতে জনবল ঘাটতি কমে আসবে এবং সেইসাথে পৌরসভাসমূহ আরও নিবিরভাবে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে। তবে যেখানে এ ধরনের কর্তৃপক্ষ নেই সেখানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভবনের নক্সা অনুমোদন এর দায়িত্ব জেলা পরিষদকে বিবেচনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে যা প্রকারন্তরে কোন কার্যকরী সমাধান নয়। বরং পৌরসভায় নগর পরিকল্পনা বিভাগ সৃষ্টি করে সেখানে প্রয়োজনীয় পেশাজীবী নিয়োগের মাধমে পৌরসভাকে শক্তিশালী করা যেতে পারে। এছাড়া যেসমস্ত এলাকা পৌরসভার অধীন নয় যথা উপজেলা ও জেলাসমূহকে উন্নয়ণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অমূল্য কৃষিজমি রক্ষার জন্য উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নগর পরিকল্পনা বিভাগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তাছাড়া সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ পরিকল্পনা কার্যকর করা একান্ত জরুরী, বিধায় উপজেলা পরিষদকেও শক্তিশালী করে পরিকল্পনা শাখার আওতায় সমগ্র জেলা ও উপজেলার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অতীব জরুরী।

ণ. দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং বিনিয়োগ বিকেন্দ্রিকরণের মাধ্যমে এবং সেইসাথে সমগ্র দেশকে জাতীয় ভৌত পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে এসে সমন্বিত ও সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

ত. সমগ্র বাংলাদেশকে পরিকল্পিত উন্নয়নের আওতায় আনার জন্য যে পরিমান পরিকল্পনাবিদ প্রয়োজন হবে তাতে পরিকল্পনাবিদদের জন্য পৃথক একটি বিসিএস ক্যাডার সৃষ্টি অতিব প্রয়োজন।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সাভারের ঘটনায় মোট ১১২৭ জন ব্যক্তি মারা গেল। অনেক সংসার জীবিকার অভাবে ধ্বংস হবে, আরো কত মানুষ যে সারাজীবন পঙ্গু হয়ে কাটাবে, তার ঠিক নেই। শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতার কারণে এতবড় ধ্বংসযজ্ঞ। এতবড় ভুল থেকে আমরা সমষ্ঠিগতভাবে শিক্ষা নেব কি নেবনা এর উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ধ্বংসযজ্ঞ। তবে প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা এবং অক্ষমতার জন্য জাতি আর একটিও মৃত্যুও দেখতে চায় না। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দূর্ণীতি প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। যুদ্ধাাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যেমন গণজাগরণ তৈরী হয়েছে তার চাইতেও অনেক বেশী গণজাগরণ প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে পরিকল্পিত বাংলাদেশ বিনির্মাণে।

___________________________

বাংলাদেশ ইনাস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স
৪ মে ২০১৩ তারিখে সাভারে মর্মান্তিক ভবন ধ্বসের প্রেক্ষিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত বি.আই.পি.-র সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য